নাইকির এয়ার জর্ডান ওয়ানকে আইকনিক ট্রেইনার বা স্পোর্টস সু মানা হয় যুক্তরাষ্ট্রে, আবার এটি মার্কিন বৃহৎ স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ডের জনপ্রিয় পণ্য। ৪০ বছর আগে বিখ্যাত বাস্কেটবল খেলোয়াড় মাইকেল জর্ডানের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এ জুতা। নাইকি অধিকাংশ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করলেও প্রায় সব ট্রেইনারই এশিয়ায় তৈরি হয়। আর এশিয়া এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক বাধার বড় শিকার। এ কারণে সংকটে পড়ছে নাইকির মতো উৎপাদনে বিদেশনির্ভর ব্র্যান্ডগুলো।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুসারে, শুল্ক ঘোষণার পরদিনই নাইকির শেয়ারদরে ১৪ শতাংশ পতন ঘটে। কারণ কোম্পানির সরবরাহ চেইনে শুল্কের প্রভাব নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীরা। নাইকির ট্রেইনারের দাম বাড়বে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অবশ্য এটি নির্ভর করছে নাইকি মূল্যবৃদ্ধির চাপ গ্রাহকের ওপর কতটুকু ফেলবে এবং শুল্ক কতদিন কার্যকর থাকবে তার ওপর।
ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও চীন থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক সবচেয়ে বেশি, ৩২-৫৪ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প হয়তো শুল্কের হার কমাতে আলোচনার দিকে যেতে পারেন। গত শুক্রবার ভিয়েতনামের নেতার সঙ্গে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ একটি ফোনালাপের কথা উল্লেখ করেন তিনি, যা হয়তো নাইকির শেয়ার পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়। তবে বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, কোম্পানিটির পণ্যে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে।
সুইস ব্যাংক ইউবিএস ধারণা করছে, ভিয়েতনাম থেকে আসা পণ্যের দাম ১০-১২ শতাংশ বাড়তে পারে, আর দেশটি নাইকি জুতার অর্ধেক তৈরি করে। বাকি জুতা উৎপাদন হয় ইন্দোনেশিয়া ও চীনে। ইউবিএসের বিশ্লেষক জে সোল বলেন, ‘শুল্কের তালিকা যত বিস্তৃত হবে তত বেশি কোম্পানি বুঝতে পারবে, দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’
মর্নিংস্টারের সিনিয়র ইকুইটি বিশ্লেষক ডেভিড সোয়ার্টসের মতে, দাম বাড়ানো সম্ভব, তবে এতে চাহিদা কমবে। জুতা শিল্প খুবই প্রতিযোগিতামূলক। তাই নাইকির জন্য ১০-১৫ শতাংশ দাম বাড়ানো কঠিন হবে। তার পরও শুল্কজনিত ক্ষতি কাটানোর জন্য যথেষ্ট হবে না।
এইচঅ্যান্ডএম, অ্যাডিডাস, গ্যাপ ও লুলুলেমনের মতো অন্যান্য পশ্চিমা ব্র্যান্ডও একই সমস্যার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে নাইকির মুনাফা কমে যাচ্ছে। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ৫ হাজার ১০০ কোটি ডলারের পণ্য তৈরি করে কোম্পানিটি। পণ্য তৈরি, শিপিং, তৃতীয় পক্ষের মুনাফা ও গুদাম ফি মিলিয়ে মোট আয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ খরচ হয়। ফলে মুনাফার মার্জিন থাকে ৪০ শতাংশের বেশি। কিন্তু অন্যান্য ব্যবসায়িক খরচ যুক্ত হলে মুনাফার হার দ্রুত কমে যায়। যেমন আয়ের এক-তৃতীয়াংশ বিক্রি ও প্রশাসনিক খরচে চলে যায়। সুদ ও করের হিসাব করলে নাইকির মুনাফার মার্জিন প্রায় ১১ শতাংশে নেমে আসে। এটি তাদের সব পণ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ প্রতিষ্ঠানটি পণ্য ভেদে আলাদা হিসাব করে না।
সোল রিভিউয়ের প্রতিষ্ঠাতা রাহুল সি বলেন, ‘দাম কম রাখতে নাইকি অন্য কিছু উপায় অবলম্বন করতে পারে। উচ্চ পারফরম্যান্স মিডসোল ফোম ও কনস্ট্রাকশনের পরিবর্তে ইনজেকশন মোল্ডেড ইভিএ (ইথিলিন-ভিনাইল অ্যাসেটেট) ব্যবহার করতে পারে। আরেকটি বিকল্প হতে পারে, এক বা দুই বছরের পরিবর্তে প্রতি তিন-চার বছর পরপর নতুন ডিজাইন আনা।’
ট্রাম্পের শুল্কনীতির অন্যতম লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানো। তবে ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারের ফ্যাশন অ্যান্ড অ্যাপারেল স্টাডিজের অধ্যাপক শেং লু মনে করেন, নাইকি বা অন্যান্য কোম্পানির জন্য সরবরাহ চেইন নতুনভাবে তৈরি করা কঠিন হবে। কারণ জুতা তৈরির জটিলতা অনেক বেশি।
শেং লু বলেন, ‘শুল্কযুদ্ধ চলতে থাকলে নাইকির দাম বাড়াতে হবে। ব্র্যান্ডগুলোর পক্ষে ৩০-৫০ শতাংশ বাড়তি খরচের বোঝা বহন করার আর কোনো উপায় নেই।’
পাওয়ার্স অ্যাডভাইজরি গ্রুপের ম্যাট পাওয়ার্স বলেন, ‘নাইকির পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনে ফিরে যাওয়া কঠিন ও ব্যয়বহুল হবে। তা করতে গেলেও কয়েক বছর সময় ও বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।’